রোহিঙ্গা ইস্যু: মুখ পুড়লো মিয়ানমারের, আন্তর্জাতিক আদালতে ঐতিহাসিক জয় গাম্বিয়ার

মিয়ানমারের বিপক্ষে গাম্বিয়া প্রায় আড়াই মাস আগে যে মামলা দায়ের করেছিল তার রায় বৃহষ্পতিবার ঘোষনা করল জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শীর্ষ আদালত। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নির্যাতন ও গনহত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। মূলত জেনোসাইড কনভেনশন লঙঘনের অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছিল।

 

গাম্বিয়া ও মিয়ানমার দুটো দেশই ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ যেটি শুধু দেশগুলোতে গণহত্যা থেকে বিরত থাকা নয় বরং এ ধরণের অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধের জন্য বিচার করতে বাধ্য করে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সমর্থিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্য-অনুসন্ধানী মিশন সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে “গণহত্যা ঠেকানো, তদন্ত করা এবং এর শাস্তির আইন করার ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে মিয়ানমার।” কানাডা, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, তুরস্ক এবং ফ্রান্সও এই অভিযোগকে সমর্থন করে।

 

শীর্ষ আদালত রায় দিয়েছে যে, মিয়ানমারকে হিংস্রতা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা মুসলিমদের রক্ষার জন্য জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গনহত্যার প্রমানগুলি রেখে দিতে হবে। গাম্বিয়ায় দায়ের করা আবেদনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালত যে সিদ্ধান্তটি নিয়েছে তা মিয়ানমারে নির্বিচারে হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগসহ কয়েক দশক ধরে চলা মুসলিম সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের প্রথম গণনা।

 

মিয়ানমারকে শীর্ষ আদালত চারটি নির্দেশনা দিয়েছে।

এক. রাখহাইনে যে সাড়ে ছয় লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিম ঝুঁকিপূর্নভাবে বসবসাস করছে তাদের সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

দুই. মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে গনহত্যা না চালায় বা কোনোরকম উস্কানীমূলক ঘটনা না ঘটায় তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।

তিন. রোহিঙ্গা গনহত্যা সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে তার পরিপ্রক্ষিতে সবরকমের তথ্যপ্রমান সংরক্ষন করতে হবে।

চার. রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য মিয়ানমার কিধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে তা উল্লেখ করে চারমাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে শীর্ষ আদালতকে এবং এরপর প্রতি ছয়মাস অন্তর প্রতিবেদন জমা দিতে হবে এবং সেগুলি গাম্বিয়ার কাছে তুলে ধরা হবে।

এই আইনী প্রক্রিয়ার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নোবেল শান্তি বিজয়ী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য দোষী হিসাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে কিনা সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি , যা আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতর অপরাধ।

 

এই অভিযোগগুলি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছে যে , তারা রোহিঙ্গা মুসলিম উগ্রপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত একটি বিদ্রোহের প্রতিক্রিয়া জানায় মাত্র। এই দলের বিরুদ্ধে কোনও পূর্বসূচী উদ্দেশ্য তাদের ছিল না।
এই রায়কে আরও দৃঢ় করার পক্ষে তথ্য দেওয়া হয়েছে যে, ২০১৭ সালের অগাস্ট থেকে প্রতিবেশী বাংলাদেশে বিক্ষিপ্ত শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে ৭০০,০০০ এরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান যারা ধর্ষণ, নির্বিচারে হত্যা ও নির্যাতনের জেরে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যায়। এছাড়াও, কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নাগরিকত্বের অধিকার বা চলাচলের স্বাধীনতা ছাড়াই মিয়ানমারে রয়েছেন। রোহিঙ্গা জোটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নায় সান লুইন বলেন ” আমরা আজ একটু হলেও ন্যায়বিচার পাচ্ছি যে , আন্তর্জাতিক আদালত কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে যে গনহত্যাই আমাদের নিপীড়নের সম্ভাব্য নাম। ন্যায়বিচার আংশিকভাবে হলেও দেখানো হচ্ছে। আমরা জানি য সামনে একটি দীর্ঘ রাস্তা রয়েছে, তবে রোহিঙ্গাদের পক্ষে এটি একটি দুর্দান্ত দিন। ”

আদালতের বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুলকাবি আহমেদ ইউসুফ বৃহস্পতিবার বলেন, “মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে মতামত নিয়েছে আইসিজে।”  তিনি বলেন, এই বিষয়ে মিয়ানমার আদালতে কোনো দৃঢ় প্রমান দিতে পারেনি। বৃহস্পতিবার মিয়ানমার আইসিজির বিরুদ্ধে তার আইনী চ্যালেঞ্জ করে দাবি করেছে যে , এই মামলার এখতিয়ার নেই। পাশাপাশি গাম্বিয়ার বিরুদ্ধেও অভিযোগ করে যে, আদালতে দাবি আনার কোনও আইনি ভিত্তি নেই। ফিনান্সিয়াল টাইমসে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে সুচি মানবাধিকার সংগঠনগুলির সমালোচনা করে তিনি বলেছেন যে “তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক তদন্তের প্রক্রিয়াকরণ ছাড়াই অপ্রমাণিত বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে। তার দেশকে নিন্দা করা হচ্ছে।”

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে মামলাটি করেছে তার রায় একটি দৃঢ় নজির স্থাপন করেছে। জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তেও স্বীকার করা হয়েছে যে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা সুরক্ষিত নয়। তারা ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে বসবাস করছে।

আইসিজে মলাটিকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দেয়, “আমরা নাগরিক অধিকার প্রদেয় সংস্থাগুলি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মান অনুযায়ী সত্য ও ন্যায়বিচারের পক্ষে একসাথে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করতে চাই।”