নির্ভয়াকাণ্ডের নিষ্পত্তি হল: ২০১২ সালের বিভীষিকার সেই রাত থেকে ২০২০-র ভোর! একনজরে

 নির্ভয়া, ফিজিওথেরাপির চার বছরের কোর্সের তিন বছর পাশ করেছে সবে। লাস্ট ইয়ারের ইন্টার্নশিপ চলছিল। স্বপ্ন পূরণ হতে তখনও কিছুটা বাকি। দিনটা ছিল ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। রবিবার, ছুটির দিনে বন্ধুর সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল নির্ভয়া। ‘লাইফ অব পাই’ দেখে ফেরার সময় দুই বন্ধুর কেউ আন্দাজ ও করতে পারেনি কোন পশুদের পাল্লায় পড়ে, কোন পথে যেতে চলেছে তাদের নিজেদের লাইফ। দক্ষিণ দিল্লির একটি সিনেমা হল থেকে বন্ধু অবিন্দ্র প্রতাপ পান্ডের সাথে যখন বাড়ি ফিরছিল, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা খুব কমই ছিল।

 

প্রথমে অটো ধরলেও পরে এক শাটল বাস পেয়ে তাতেই ওঠেন দুই বন্ধু। বাসে চালক সহ যাত্রী সংখ্যা ছিল মাত্র ছয়। তাঁরা উঠতেই একজন বন্ধ করে দেয় বাসের দরজা। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে অবিন্দ্র। তাকে শান্ত করতে দু-তিন জন মিলে মারতে শুরু করে। এক পর্যায়ে লোহার রডের ঘা বসিয়ে দেয় তার মাথায়। অন্যদিকে নির্ভয়া কে ছিড়ে খেতে থাকে দুষ্কৃতীরা। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে নির্ভয়া। এতে শান্তি হয়নি নরপিশাচদের। গণধর্ষণের পর কাতরাতে থাকা নির্ভয়ার যৌনাঙ্গে মরচে ধরা একটি এল আকৃতির রড ঢুকিয়ে ঘোরাতে থাকে এক মানুষ রুপি জানোয়ার। পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী, মহীপালপুরে অবিন্দ্র এবং নির্ভয়াকে বাস থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়। তাদের উদ্ধার করে সফদরজঙ্গ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

 

কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় ২৭ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরের একটি অত্যাধুনিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় নির্ভয়াকে। আর সেখানেই ২৯ ডিসেম্বর জীবন যুদ্ধ শেষ হয় তাঁর। এরপর শুরু হয় সন্তান হারানো হতভাগ্য এক বাবা মায়ের যুদ্ধ। মেয়ের মৃত্যু শোক বুকে নিয়েই, মেয়ের আত্মাকে শান্তি দিতে আইনি লড়াইয়ে নামেন নির্ভয়ার বাবা মা।

ঘটনা শুনে শিউরে ওঠার পাশাপাশি গর্জে ওঠে গোটা দেশবাসী। ১৮ ডিসেম্বর, ২০১২ অভিযুক্ত বাসচালক রাম সিংহ, তার ভাই মুকেশ, বিনয় শর্মা ও পবন গুপ্ত কে গ্রেফতার করে পুলিশ। এবং ২১ ডিসেম্বর, ২০১২ তে অপর এক অভিযুক্ত ধৃত হয় দিল্লির একটি বাস টার্মিনাল থেকে। বিহার থেকে গ্রেফতার করা হয় অক্ষয় ঠাকুরকে ২২ ডিসেম্বর, ২০১২। ২২ ডিসেম্বরেই দিল্লির হাসপাতালে রেকর্ড করা হয়েছিল নির্ভয়ার বয়ান। পরবর্তীতে ২৯ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মারা যায় সে। এর মধ্যে গোটা দেশ ক্ষেপে ওঠে অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে।

তার জেরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর নেতৃত্বে ইউপিএ সরকার নির্ভয়ার তদন্তে গঠন করে বিচারবিভাগীয় কমিটি। কমিটির সুপারিশ এ ২০১৩ সালের ২রা জানুয়ারি ধর্ষণ মামলার জন্য দেশে প্রথম ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠিত হয়। এরপর ১১ মার্চ, ২০১৩ তে জেলের মধ্যে আত্মহত্যা করে অভিযুক্ত রাম সিং। এবং ৩১অগাস্ট, ২০১৩ অন্য এক অভিযুক্তকে নাবালক হিসেবে ৩ বছরের জন্য পাঠানো হয় প্রবেশন হোমে। হাজার প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা সত্তেও ১০ দিনের মাথায় বাকি চার আসামি তথা মুকেশ সিংহ, বিনয় শর্মা, পবন গুপ্ত এবং অক্ষয় ঠাকুরকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর এই চার আসামির ফাঁসির আদেশ দেয় ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট। কিন্তু এরপর ও শুরু হয় প্রাণ ভিক্ষার আর্জি। আইনের ফাঁক ফোকর গুলো ধরে পরিকল্পিত ভাবে আর্জি জানাতে থাকে অপরাধীরা। দফায় দফায় কখনও রায় সংশোধন, কখনও ক্ষমাভিক্ষা ইত্যাদির আর্জি চলতে থাকে অপরাধীদের দিক থেকে। ফলে বার বার পেছতে থাকে ফাঁসির দিন। এরপর যথাক্রমে ১৩মার্চ ২০১৪, ২০ ডিসেম্বর ২০১৫, ৫মে ২০১৭ ফাঁসির সাজা বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্ট। এযাবৎকাল ধরে বার বার অপরাধীদের আর্জি এবং তা খারিজ হতে থাকে দিল্লি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে।

এরপর চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি ফাঁসি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও আবারও তা পিছিয়ে ১ ফেব্রুয়ারী ভোর ৬ টা হয়। কিন্তু আবারও একইভাবে পিছিয়ে যায় শুনানি। পরে ৩ মার্চ ধার্য করা হয় ফাঁসির দিন। তবে সেদিন কার্যত সম্ভব হয়নি চার আসামির ফাঁসি। ফের যাবতীয় আইনি জটিলতা কাটিয়ে ২০ মার্চ ভোর ৫.৩০ এ ঝোলানো হয় চার আসামি কে।