ফসলের ফয়সালা কৃষকরাই করুন, সরকার কৃষকের পাশে থাকুক, কৃষকের ভেকধারী কোম্পানী রাজের হাতে নয়

মোদী সরকারের কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে চলমান কৃষক আন্দোলন ভারতের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব গণজাগরণ। জুন মাসে লকডাউনের মাঝে মানুষের সঙ্কটে মুনাফার সুযোগ খোঁজা সরকার যখন অর্ডিন্যান্স জারি করে, তখন থেকেই আন্দোলন শুরু। সেপ্টেম্বরে অর্ডিন্যান্সকে জোর করে আইনে পরিণত করার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। দেশ জুড়ে বিরোধ শুরু হয়। ২৬ নভেম্বর সংবিধান দিবসে দেশব্যাপী শ্রমিক ধর্মঘটের মাঝে কৃষক আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছে যায় রাজধানীর সীমানায়। রাস্তা খুঁড়ে, ব্যারিকেড তুলে, জল-কামান আর অশ্রু-গ্যাসের গোলা ছুড়ে সে ঢেউকে আটকে রাখা যায়নি।

২৬ নভেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত গোটা দেশে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে যায়। দিল্লি সীমান্তে সিংঘু, টিকরি, গাজ়িপুর বর্ডারে গড়ে ওঠে কৃষক প্রতিবাদের ছাউনি। সরকারের যাবতীয় অপপ্রচার সত্ত্বেও আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও গণসমর্থন তাকে রক্ষণাত্মক অবস্থায় ঠেলে দেয়। আন্দোলনকে লাঠি গুলি চালিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া বা উপেক্ষা ও ক্লান্তিতে কৃষকের মনোবল দুর্বল করে দেওয়া, দুই রাস্তাই বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় সরকার ও কৃষক নেতাদের আলাপ আলোচনা। সমাধান খোঁজার কোনও ইচ্ছে অবশ্য চোখে পড়েনি, আলোচনার নামে কৃষকের ধৈর্যের এবং ঐক্যের পরীক্ষা নেওয়াই বোধ হয় ছিল সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য।

কিন্তু সরকারের সমস্ত আশায় জল ঢেলে, আমাদের সমস্ত আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে কৃষক আন্দোলন আরও বেশি শক্তি ও প্রত্যয় নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পঞ্জাবের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে এসেছে হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ। জেলায় জেলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে মহাপঞ্চায়েত। উপচে পড়ছে হিন্দু মুসলিম ভেদাভেদ ভুলে কৃষকের ভিড়। মুজফ্ফরনগর দাঙ্গা জাঠ ও মুসলিম কৃষকদের মধ্যে যে প্রাচীর তুলে দিয়েছিল, তা ভাঙতে শুরু করেছে। কৃষক নেতারা ২ অক্টোবর গাঁধী জয়ন্তী পর্যন্ত সরকারকে সময় দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন কৃষক আন্দোলনে ক্লান্তি নেই। আর আন্দোলন যত দীর্ঘ হবে ততই তার বিস্তার ঘটবে, ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ও সামাজিক গভীরতা, দু’দিক থেকেই।

প্রধানমন্ত্রীর মতে, ছোট কৃষকের স্বার্থেই নাকি এই আইন। ছোট কৃষকরা কি নিজেদের স্বার্থ বোঝেন না? এই আইন দাবি করা তো দূরের কথা, আইনের বিরুদ্ধে তাঁরা খুবই সরব। এই আন্দোলনে বিপুল অংশগ্রহণ তাঁদেরই। এই আইনে যদি ছোট কৃষকের লাভ হওয়ার কথা, তবে তো এত দিনে বিহারের কৃষকদের কপাল খুলে যেত। ২০০৬ সাল থেকে এনডিএ সরকার ওখানে কৃষি বাজার সমিতি ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে কৃষি বিপণনের দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এর ফল দাঁড়িয়েছে এই যে, আজ সবচেয়ে কম কৃষকের ফসল কেনে বিহার সরকার, সবচেয়ে কম দাম পায় বিহারের কৃষক, কৃষি আয়ের দিক থেকে তাঁরা দেশে সবার পিছনে।

কৃষকরা মাসে পাঁচশো টাকার লোকদেখানো ‘সম্মান’ চাননি, চেয়েছেন ন্যায়সঙ্গত ন্যূনতম সমর্থন মূল্য বা এমএসপি। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মতো তা হওয়া উচিত সমগ্র কৃষি খরচের অন্তত দেড় গুণ। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, এমএসপি ছিল, আছে, থাকবে। এটা কি স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মানা এমএসপি, যা বিজেপির ইস্তাহারে ছিল, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সরকার সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে বলেছিল এটা করা যাবে না? এমএসপি-র গ্যারান্টি কি সরকার দেবে, যাতে এমএসপি-র কম দামে কেউ কিনতে না পারে আর বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে কৃষক দাম হাতে পায়? প্রধানমন্ত্রী বলছেন, মান্ডিব্যবস্থা বহাল থাকবে, শুধু কেউ চাইলে অন্যত্র বিক্রি করতে পারেন। বিএসএনএল ও বহু পাবলিক সেক্টর খাতায় কলমে এখনও আছে, কিন্তু সরকারি বদান্যতায় সে জায়গায় কারা ফুলে ফেঁপে উঠছে, তা দেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে জানেন।

জমি, চাষ ও ফসল— এই তিনটে কেন্দ্রীয় বিষয় নিয়েই বড় বড় কৃষক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। নীলকর সাহেবদের চাপিয়ে দেওয়া নীলচাষের ফরমানের বিরুদ্ধে কৃষকের ধূমায়িত বিক্ষোভ থেকে উঠে এসেছে চম্পারণ সত্যাগ্রহ। জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠেছে: লাঙল যার জমি তার। ফসলের অধিকারের দাবি রচনা করেছে অমর গণসঙ্গীত: হেই সামালো…। এ বারের আন্দোলনের মূল কথা আবার ফসলের অধিকার। ফসল, তুমি কার? ‘আত্মনির্ভর’ ভারতের ক্ষুধা মেটাতে আবার যেন আমেরিকার গমের উপর আমরা নির্ভর না হয়ে পড়ি।